 |
‘স্বচ্ছতার স্বার্থে বিচারপতিদেরও সম্পদের হিসাব দেয়া উচিত’- নতুন বিচারপতির এ কালজয়ী ঘোষণা কী ‘বিচারকরাও সমালোচনা ও ভুলের উর্ধ্বে নন’- সে সত্যেরই প্রতিধ্বনি মাত্র?
সব প্রশংসা মহান আল্লাহ পাক-এর জন্য। সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি অফুরন্ত দরূদ ও সালাম। নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম রোববার তার খাসকামরায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘স্বচ্ছতার স্বার্থে বিচারপতিদেরও সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত।’ উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতিরা রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন। ৯৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো অতিরিক্ত বিচারককে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে স্থায়ী বিচারক হিসেবে ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিয়োগ দিতে পারবেন। ৯৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত বা অপসারিত বিচারককে সরকার যে কোনো বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। আবার তাদের ইচ্ছা করলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী বানাতে পারেন বা রাষ্ট্রপতি পদেও নিয়োগ দিতে পারেন। আবার ১১৫ অনুচ্ছেদে অধস্তন আদালতের জজদের বা ম্যাজিস্ট্রেটদেরও রাষ্ট্রপতি সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নিয়োগ দান করবেন। এ ক্ষেত্রে ১৯৭৫ সালে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান উঠিয়ে দেয়া হয়, যা আজ পর্যন্তও পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়নি। তবে ভারতের সংবিধানে বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেদিক থেকে সংবিধানের ৯৫, ৯৮, ৯৯ ও ১১৫ অনুচ্ছেদের পর্যালোচনা সাপেক্ষে বলা যায়, সরকার বিচার বিভাগের এমন সব ব্যক্তিদের বিচারক নিয়োগ দান করবেন যারা সরকারের পক্ষে রায় দেয়ার মনমানসিকতাসম্পন্ন। অপরদিকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ করার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হবে, শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে তার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে অযোগ্য হয়ে পড়েন। গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হতে পারেন, সেই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি কাউন্সিলকে বিষয়টি সম্পর্কে তদন্ত করতে ও এর তদন্ত ফল গোপন করার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। কাউন্সিল তদন্ত করার পর রাষ্ট্রপতির কাছে যদি এরূপ রিপোর্ট করেন যে, তার মতে ওই বিচারক তার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের অযোগ্য হয়ে পড়েছেন। গুরুতর অসদাচরণের জন্য দোষী হয়েছেন। তা হলে রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা ওই বিচারককে তার পদ থেকে অপসারিত করতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা বর্তমানে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তাদের কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের ৯৪ (৪) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী এই শাসনতন্ত্রের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতিরা বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট সর্বোচ্চ আদালত এবং সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে অভিহিত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য কোনো ব্যক্তিকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। যোগ্যতা হিসেবে তাকে সুপ্রিম কোর্টে ১০ বছর অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে অন্যূন ১০ বছরকাল কোনো বিচার বিভাগীয় পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন বা অন্যূন ১০ বছরকাল অ্যাডভোকেট ছিলেন। এবং অন্যূন ৩ বছর জেলা বিচারকের ক্ষমতা নির্বাহ করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রত্যেক বিচারক ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত নিজ পদে বহাল থাকতে পারবেন। তিনি যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারবেন। কেবল প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অপসারণের প্রস্তাব পাস করলে সেই প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রপতি সেই বিচারকের অপসারণ করতে পারবেন। প্রসঙ্গত নতুন প্রধান বিচারপতি বলেছেন, আমাদের দেশে বিচারপতিদের সম্পদের বিবরণী জমা দেয়ার কোন বিধান নেই। এ ব্যাপারে কেউ দাবিও উত্থাপন করেনি। ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, সম্পদের বিবরণী জমা দেয়া উচিত। মামলার জট কমানো উচিত। জনগণ যাতে স্বল্প সময়ে, স্বল্প খরচে মামলার নিষ্পত্তি করতে পারে সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া উচিত। এটা যেন কেউ বলতে না পারে বিচার পাইনি। বিচার পেতে যাতে অবিচারের শিকার হতে না হয় সে চেষ্টা থাকা উচিত। ১৫ কোটি মানুষের বিচার দরকার। বিচার পাওয়ার প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। নতুন প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ’৮০ থেকে ’৯০ সালে মামলার জট ছিল। এ জট থেকে এখনও মুক্ত হতে পারছি না। প্রতিনিয়তই নতুন নতুন মামলা হচ্ছে। তাছাড়া বিচারকদের বসার স্থান, আদালত ভবনসহ নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। এসব কারণে মামলার জট কমানো যাচ্ছে না। তাছাড়া বিচারকদের প্রশিক্ষণের অভাবও রয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতির একটি মন-ব্য সম্পর্কে নতুন প্রধান বিচারপতি বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি বলেছেন, বিচারপতি নিয়োগের ফলে প্রলয় ঘটে গেছে। এ বিষয়টি এখনও খতিয়ে দেখিনি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। উল্লেখ্য, বিচারক নিয়োগ ও বিয়োগ সম্পর্কে যত তথ্যই আহরণ করা হোক না কেন সে তথ্যের সমাহারে এমন বলার জো নেই যে, সব বিচারকই সব সময় দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকবেন। সব সময়ই স্বচছ থাকবেন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগসহ বিচারপতির জাল সার্টিফিকেট প্রচারণাসহ সামপ্রতিক আমলে অনেক বিচারপতিদের ক্ষেত্রে এরূপ বহু অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে গেছে। এমনকি কোন বিচারপতির বিদায়গ্রহণের অনুষ্ঠানেও তিনি তার পূর্ব পক্ষপাতপূর্ণ বিচারের জন্য প্রকাশ্য অপমানিত হয়েছে সে উদাহরণও অতি সমপ্রতি হয়েছে। বলাবাহুল্য, বিচারপতি ফেরেশতা নন। তিনি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকলেও তার বিবেচনাপ্রসূত রায়ও যে ভুলের ঊর্ধ্বে হবে তা কীভাবে বলা যায়? এক্ষেত্রে সদ্য নিযুক্ত প্রধান বিচারপতির বক্তব্য একটি মাইলফলক। তিনি বিচারকদের স্বচ্ছতার জন্য সম্পদের হিসাব বিবরণীর কথা বলেছেন। আমরা মনে করি, এটা একটা শুরু মাত্র। কারণ, সম্পদের হিসাব বিবরণী যদি স্বচ্ছতার জন্য জমা দিতে হয়, তবে একইভাবে স্বচ্ছতা পরিস্ফুটনের জন্য আরো অনেক কিছুই মনিটরিংয়ের প্রয়োজন রয়েছে। দেরিতে হলেও প্রধান বিচারপতির এ বক্তব্যে মূলতঃ ‘বিচারপতিরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন, বিচারপতিরাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন’- সেই সত্যেরই প্রতিধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে। এক্ষেত্রে বিচার বিভাগসহ সরকারের সব বিভাগের মাঝেই স্বচ্ছতা ও শুদ্ধতা এবং প্রজ্ঞা ও দক্ষতার সফল প্রতিফলন ঘটাতে হবে। মূলতঃ এ সদিচ্ছা ও সচেতনতা তখনই অর্জিত হবে যখন যথাযথ ইসলামী মূল্যবোধ জাগরুক থাকবে। কিন' তার জন্য প্রয়োজন খাছ রূহানী ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহ। যামানার ইমাম ও মুজতাহিদ, মুজাদ্দিদে আ’যম, রাজারবাগ শরীফ-এর হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা মুদ্দা জিল্লুহুল আলী-এর নেক ছোহবতেই তা সম্ভব। মহান আল্লাহ পাক আমাদেরকে তো নছীব করুন। (আমীন) |
|
 |