 |
বিশেষ প্রতিবেদন - ১৪ এপ্রিল, ২০১২
থার্টিফার্স্ট নাইট, ভ্যালেন্টাইন ডে আর পহেলা বৈশাখের নামে হুজ্জোতির জন্য ধর্মব্যবসায়ীদের কৌশলগত নিষ্ক্রিয়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন ধর্মীয় আন্দোলন বিমুখতা আর স্বার্থবাদী মৌসুমী রাজনৈতিক তৎপরতাই দায়ী
-মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান
কি অর্থনীতি, কি প্রচলিত রাজনীতি, কি সাহিত্য, কি প্রযুক্তি সবক্ষেত্রেই একটা অসহনীয় গুমোট বন্ধাত্য জেঁকে বসলেও হুজুগের ক্ষেত্রে এ জাতির সৃষ্টিশীলতা তথা উন্মাদনার জোয়ার তরঙ্গের ঊর্মি কেবলই উছলে উঠে। সময়ের পরিক্রমায় পক্কতার পরাকাষ্ঠায় প্রয়াসী হতে এ প্রজন্মও ব্যর্থ হলো। হুজুগে বাঙ্গালী এ প্রবাদেরই ঐতিহ্যই তারা আরো ঘনীভূত করলো। নদী বিধৌত এ উর্বর ভূমির উর্বরতা খর্ব হলেও খর্ব হয়নি এদেশবাসীর হুজুগে মাতা ঊর্বর মস্তিষ্কের। যে কোন ক্রেজ এনে তা প্রচলন করার মত জাতীয়ভাবে এমন উর্বর মন-মস্তিষ্ক সত্যিই অদ্ভূত ও বিরল বটে। ১৯৯৩ সালে যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান ভ্যালেইন্টাইন ডে’র কথা বললেন। এ সম্পর্কে পত্রিকাটির এবারের ভালোবাসা সংখ্যায় সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, “এটি নিয়ে বাংলাদেশ গর্বিত হতে পারে। বাংলাদেশে ১৯৯৩ এ যায়যায়দিন প্রথম ভালবাসা দিন পালনের আহবান জানিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।” উল্লেখ্য, সে আহবানে হুজুগে মাতা বাঙ্গালী কিরূপ মেতে তাদের মন মস্তিষ্কের উর্বরতা কতটুকু জাহির করেছে তা এখন অন্ধও টের পাচ্ছে। অথচ প্রকৃত ঘটনা হলো, আশির দশকে কার্ডের ব্যবসার মন্দা কাটতেই ব্যবসায়ীরা এই উদ্যোগ নেয়। ডিসেম্বরের ক্রীসমাস ও নিউ ইয়ার কার্ডের পর মার্চ-এপ্রিলে ইস্টারের কার্ড বিক্রির আগ পর্যন্ত তিন মাস ব্যবসা বন্ধ থাকতো। সেটা কাটতেই ফেব্রুয়ারিতে ভ্যালেইন্টাইন ডে’র ধারণা প্রবর্তন করে ভালেইন্টাইন ডে’র কার্ড ব্যবসা শুরু হয়। গ্রীটিংস কার্ড এসোসিয়েশন বলেছে, এই দিনে কমপক্ষে একশ’ কোটি কার্ড বিনিময় হয়। পশ্চিমা ব্যবসায়ীদের মতই পশ্চিমা বিলাসী শফিক রেহমান জাতিকে একটা সংস্কৃতি শিক্ষা দেবার কর্ণধার হওয়ার গোপন অভিপ্রায়ে ভালবাসার দিবসের হুজুগ তুললেন। আর তাতেই মেতে উঠলো হুজুগে মাতা বাঙ্গালী। আর সুযোগ সন্ধানী শফিক রেহমানও এখন বগল বাজিয়ে বলছেন এ ক্রেডিটটি তারই। উল্লেখ্য, এ হুজুগে মাতা প্রবণতা আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্যের, আমাদের আত্ম-উপলব্ধির সুস্থবুদ্ধি ও প্রজ্ঞার তথা স্বকীয়তার সীমাহীন দৈন্যতা প্রকাশ করে। প্রসঙ্গত থার্টি ফার্স্ট নাইট আর পহেলা বৈশাখ দিয়ে এখন যে হুজ্জোতি আর হুজুগের অনুকরণ চলছে তা মোটেও সুস্থ নয়। অথচ বর্ষবরণ সংস্কৃতিটি প্রাচীন হলেও এখন যেভাবে এটি পালিত হচ্ছে সে ঐতিহ্য বাঙ্গালীর নয়। ইতিহাস বলে, “খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫০ থেকে ১৬০০ সালে প্রাচীন মিসরীয়রা চূড়ান্ত রকমের মদ্যপান আর বাদ্যযন্ত্রের উন্মাতাল শব্দে নেচে-গেয়ে বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো বর্ষবরণের খবর তৈরী করেছে।” বিবিসি সূত্রে জানা গেছে, লুক্সর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণা দল মিসরে মুত দেবীর মন্দির খনন করে এ তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন। গবেষণা দলের প্রধান বেটসি ব্রায়ান বলেন, মিসরীয়দের সবচেয়ে পুরানো পার্বণের মধ্যে বর্ষবরণ অন্যতম। মিসরীয়দের বর্ষবরণের পুরোটাই শস্য এবং বন্যার উপর নির্ভরশীল ছিল বলে তিনি জানান। তাদের বর্ষবরণ শুরু হত বর্তমান আগস্ট মাসে। এর হিসাব ছিল বছরের সবচেয়ে বড় বন্যা হয়ে যাওয়ার পরের বিশ দিন হবে বর্ষবরণ। মিসরীয়দের শস্য চাষের জন্য বন্যা ছিল অতি জরুরী। বন্যার পরবর্তী পলিতে প্রচুর পরিমাণে জন্মাত গম এবং বার্লি। এ বার্লি থেকেই তারা পাতনের মাধ্যমে লাল মদ তৈরি করতো। বর্ষবরণে লাল মদের সাথে চলতো নৃত্যগীত তথা বল্গাহারা আনন্দ ফুর্তি। মিসরীয়দের বর্ষবরণ করার মূল লক্ষ্য ছিল মদ পানের প্রভাবে বেহুঁশ হয়ে যাওয়া। এটাকে দেবতার সাথে সাক্ষাতের মাহন্দ্রক্ষণ মনে করা হতো। যারা নতুন বছরে এটা করতে পারতো তাদেরকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করা হতো। অতএব, দেখা যায় বর্ষবরণের সাথে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুভূতি যোগটা সে শুরু থেকেই ছিল বা বর্ষবরণকারীরা ধর্মীয় বিশ্বাসের আলোকেই তা করতো। অথবা বর্ষবরণকে তাদের বিশেষ ধর্মীয় আচার বলে বিশ্বাস করত। মজুসী বা অগ্নিউপাসকরা এখনো বর্ষবরণকে সরকারিভাবেও ব্যাপক জাকজমকভাবে পালন করে থাকে। একে তারা তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গ মনে করে এবং একে নওরোজ বা নতুন দিন বলে অভিহিত করে। এদিকে সারাবছর ইসরাইলীরা মদ, নারীনৃত্যে বিভোর থাকলেও বর্ষবরণ তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গের বিরোধী। বর্ষবরণকে তারা খ্রিস্টানী কালচার মনে করে। এ ব্যাপারে তাদের ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যা তাদের ক্ষেত্রে বিরাট প্রভাব ফেলে। বর্ষবরণে তারা খ্রিস্টান দুনিয়ার মত অত উন্মাতাল নয়। স্মর্তব্য, ধর্ম এবং ধর্মবেত্তাগণ সমাজের মূল অভিভাবক। সামাজিক গতিশীলতার কারণে সর্বভূক সংস্কৃতিও সব কিছু গোগ্রাসে গলাধঃকরণ করতে পারে। কিন্তু বৈচিত্র্যময়ী সমাজের প্রেক্ষাপটে অবাধ সংস্কৃতি কখনো সুখকর নয়। ধর্মের ভিন্নতা, মূল্যবোধের প্রকারভেদ, আর্থ-সামাজিক ও ভৌগলিক ক্ষেত্র বিশেষের কারণে সংস্কৃতিও হয়ে উঠে অনিবার্যভাবে ভিন্ন থেকে ভিন্নতর। প্রসঙ্গতঃ পুজিবাদী ও বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তিতে ভোগবাদী মানসিকতা ও সভ্যতা এখন সারাবিশ্বে জেঁকে বসেছে। খ্রিস্টীয় ধর্মের অযার্থতা ও অবাস্তবতা এবং সঙ্গতঃকারণেই তার প্রতি বীতশ্রদ্ধা ও বিতৃষ্ণা থেকেই এবং তাদের মধ্যে ভোগবাদ ও ক্ষণিক সুখবাদ সংস্কৃতি ব্যাপকতা লাভ করেছে। পারিবারিক বন্ধন ও সমাজিক মূল্যবোধ এখন তাদের মাঝে অবশিষ্ট নেই। ফলতঃ এ সংস্কৃতি উদ্ভূত যে কোন উৎসবই যে দেহাত্মবাদ তথা ভোগবাদ আর অশ্লীলতায় পর্যবসিত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। থার্টিফার্স্ট নাইট কালচার, ভ্যালেন্টাইন ডে ছাড়াও পাশ্চত্য অনুকরণে আকবর প্রবর্তিত ফসলী সনের বর্ষ আজকের পহেলা বৈশাখে যে রূপ ধারণ করেছে তা বোঝার জন্য যথেষ্ট। পহেলা বৈশাখের হাওয়ায় রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী সবাই আলোচিত হয়েছেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য নীরবতা পালন করেছেন এবং নিষ্ক্রিয় থেকেছেন একটি মহল।। অথচ এদেরই কিনা সরব ও সোচ্চার হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে বেশী। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, তারা এখন ব্যাঙের হাইবার নেশন পিরিয়ড বা শীত নিদ্রায় ঘুমিয়ে রয়েছে। এ পিরিয়ড পার হয়ে নির্বাচনের মৌসুম আসতেই তারা আবার ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ আওয়াজের ঐক্যতান তুলবে। তখন তারা সোৎসাহে গগণবিদারী হাক ছাড়বেন। ইসলাম গেল, অনৈসলাম ঠেকাও, ইসলাম আন ইত্যকার মহা ইসলাম দরদী আহবান নিয়ে তারা বাড়ী বাড়ী ঘুরবেন। ইসলাম রক্ষার জন্য ভোট চাবেন। ইসলামের ত্রাণকর্তা সেজে বসবেন। কিন্তু এখন তারা নাকে তেল দিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছেন। তাই তারা দেখতে পাচ্ছেন না, যে আমজনতার কাছে তারা ভোট চাবেন তারাই আজ থার্টি ফাস্ট নাইট, ভ্যালেন্টাইন ডে, আর পহেলা বৈশাখের নামে কি বল্গাহারা রেওয়াজে মেতে উঠেছিল বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত রিপোর্টগুলো তা অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট। (ক) নববর্ষে আনন্দে মাতোয়ারা বাঙ্গালী বাঙ্গালীর নববর্ষে এবার সারাদেশ ছিল আনন্দে মাতোয়ারা। রাজধানী ঢাকায়ই নয়, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশালসহ দেশ জুড়ে ছিল যেন মহোৎসব। এত আনন্দ কেউ যেন কখনও দেখেনি। রমনা বটমূলকে কেন্দ্র করে পুরো রমনা এলাকায় ছিল মানুষের অবিরাম স্রোতধারা। (দৈনিক যুগান্তর, ১৬ই এপ্রিল-২০০৬) (খ) জনসমাগমে রেকর্ড ভঙ্গ নববর্ষের প্রথম দিনে রাজধানীর সর্বত্রই ছিল বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো জনস্রোত। অতীতের সব রেকর্ড ম্লান করে দিয়েছে এবারের জনসমাগম। রমনা, চারুকলা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছিল উপচে পড়া ভিড়। মানুষের ঢলে বন্ধ হয়ে যায় আশপাশের সড়কের যান চলাচল। নারী-পুরুষের সঙ্গে এবার শিশুদের অংশগ্রহণও ছিল লক্ষণীয়। সবার মাঝেই এক ধরনের স্বস্তি ও উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। (দৈনিক মানবজমিন, ১৬ই এপ্রিল-২০০৬ ঈসায়ী) (গ) রাজধানীতে উৎসবের প্রাণ কেন্দ্র রমনা বটমূল এবং আশপাশের এলাকায় ভোর থেকে বেশ খানিকটা রাত পর্যন্ত চোখে পড়ে লাখ লাখ মানুষের মহামিলনের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। তপ্ত রোদ আর কালবৈশাখীর আশঙ্কার মতো প্রকৃতিগত বৈরিতাকে উপেক্ষা করে মানুষের ঢল নামে। হৃদয়ের এক অমোঘ টানে সবাই ছুটতে থাকেন উৎসব অভিমুখে। সে স্থানে পৌঁছতে তীর্থ যাত্রীদের মতো পদযাত্রাই ছিল ভরসা। মানুষের সেই সমুদ্রে পৌঁছানোর সাধ্য ছিল না কোন যান্ত্রিক বাহনের। রমনা এলাকার চারপাশের পথ ছিল যানবাহনের জন্য রুদ্ধ। উৎসবে যোগ দিতে দীর্ঘ পদযাত্রাও ক্লান্ত শ্রান্ত করতে পারেনি কাউকে। সেউ আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটছিল তাদের চলার মধ্যেই। সপরিবারে আসা অনেকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শিশু সন্তানকে। এভাবে উৎসব প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হওয়া জনসমুদ্রে আরও বিশালতা আনতে ভোর থেকে রাত অব্দি মানুষের ঢল নামতেই থাকে। উৎসব প্রাঙ্গণে ইলিশ, পান্তা আর পিঠা ভোজে মেতে উঠেন। খাবারের মতো পোশাকেও শিশু, তরুণ বৃদ্ধ সবাই ছিলেন শতভাগ বাঙ্গালী। তরুণীদের পরনে ছিল সাদা লালের ছটা থাকা শাড়ির, ফুলের গহনা, তরুণদের পোষাকে পাঞ্জাবি আর ফতুয়ার ছিল একচেটিয়া আধিপত্য। অনেকেই বাহু, গালে শিল্পীদের কাছ থেকে আল্পনা এঁকে নেন। রঙিন, পাখা, কৃত্রিম ফুলের ঝাড়, চুড়ি, মটির গহনা, মুখোশের পসরা সাজিয়ে বসা হকারদের বিক্রিও ছিল তুঙ্গে। ঐতিহ্যগত উৎসব হলেও দু’তিন বছর যাবত মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময়ের আধুনিক রূপ এবারও চালু ছিল বেশ জোরে শোরে। প্রত্যেকবারের মতো উৎসবের মূল ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন মঙ্গল শোভা যাত্রায় ছিল বর্ণাঢ্য রূপ।” (দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৬ই এপ্রিল) পদ্মশঙ্খ, ভ্রমরপদ্ম এবং ইয়াকিংদের উল্কি কালচার যারা নববর্ষের প্রাতঃকালীন অনুষ্ঠানে গেছেন তারা দেখেছেন যে, বিশেষ ধর্মের দেবদেবী বা জন্তু জানোয়ারের প্রতিকৃতি, দেবী কালির ব্যাদান করা রক্তলাল জিহবা, দেবতা কাতিকের বাহন, গণেশের হস্তীমস্তক এবং প্রলম্বিত সুঁড় লক্ষ্মীদেবীর পেচকমূর্তি, মনসাদেবীর সর্পমূর্তি, কুকুর-গাধাসহ জন্তু জানোয়ারদের মুখোশ পরিধান, ধর্মবিশেষের সীমান্ত সিঁদুর, ঢোল, করতাল ও মন্দির বাদ্যসহ ধুতি আর দেশোয়ালী ঢঙে শাড়ী পরিহিত মানব-মানবীর মিছিলের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতিকে একটি বিশেষ ধর্মীয় সংস্কৃতি বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। ইয়াংকিদের উল্কি কালচার নারীদেহের স্পর্শকাতর অংশগুলোয় বিশেষধরনের উল্কি এঁেক দেয়া অবশ্যই বাংলাদশী কালচার নয় মুসলিম কালচারও নয়। এই প্রতিনিধি উল্কি সংস্কৃতির উৎকট প্রকাশ দেখেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশে। সেখানে শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ এবং হিসপ্যানিক নির্বিশেষে যুবক-যুবতী এবং মধ্য যৌবনাদের মৃণাল বাহু, পেলব, পোল এমনকি বক্ষ প্রদেশের বিরাট উন্মোচিত স্থানে কালো, খয়েরী এবং শ্যাওলা রঙের উদ্ভট উল্কি অঙ্কিত দেখেছেন। বলাবাহুল্য, এগুলো আদিম জৈব তাড়নার প্রতি পরোক্ষ আহবান। বিশালদেহী পুরুষরা যেমন তাদের পেশীবহুল প্রতঙ্গে উল্কি একে রমণীদেরকে প্রলুদ্ধ করে, তেমনি রমণীরাও সবচেয়ে সেনসিটিভ স্থানগুলোতে উল্কি এঁেক পুরুষদের প্রলুব্ধ করে। দুঃখের বিষয়, গত দুই বছর হলো নববর্ষ অনুষ্ঠানেও রমণী অঙ্গে এ ধরনের উল্কি আঁকা হচ্ছে। আরো লজ্জার বিষয় হলো এই যে, উল্কি অঙ্কনের ওইসব উত্তেজক দৃশ্যাবলী প্রায় সব প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেল থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। চরম ধিক্কারের বিষয় হলো এই যে, এসব এক শ্রেণীর অর্বাচীন ধারা ভাষ্যকারকে ওই সব কার্যাবলীকে আবহমান বাংলার জাতীয় ঐতিহ্য এবং ইতিহাস আশ্রিত সংস্কৃতি বলে প্রচার করতে দেখা গেছে।” (দৈনিক ইনকিলাব) অথচ কি জামাতে ইসলাম, কি নেজামে ইসলাম, কি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, কি খেলাফত মজলিশ, কি খেলাফত আন্দোলন অথবা কি তথাকথিত খতীব যারা ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালন করা বিদয়াত ও খ্রিস্টানী কালচার অভিহিত করে খুৎবা দেন, সেমিনার মাহফিল করেন, লেখালেখি চালান তারা এতকিছুর পরও একবারেই নিশ্চুপ ছিলেন। কিন্তু নির্বাচন এলে তারাই আবার ইসলামের নামে এদের কাছে ভোট চান। তখন তাদের ভোট না দিলে ইসলাম আসবেনা বলে প্রচার করেন। ভোট দিলে তারা অনৈসলামের বিরুদ্ধে কথা বলবেন বলে ওয়াদা দেন। কিন্তু এখনও ঈদে মীলাদুন নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে বললেও উপরোক্ত কাজগুলো যে অনৈসলামী ও অবাঙ্গালী সংস্কৃতি একথা এখন বলার হিম্মত ও কুয়ত তাদের কোথায়? কাদিয়ানীদের থেকে টাকা খেয়ে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধেই তাদের জঙ্গী মিছিল মিটিং করাব খবর বহু। হঠাৎ মহিলা ফুটবলের বিরুদ্ধেও কিছুদিন পূর্বে তারা নামকাওয়াস্তে আন্দোলন-ফান্দোলন দেখিয়েছেন। কিন্তু সে সবই যে রাজনৈতিক স্বার্থ প্রণোদিত- থার্টি ফার্স্ট নাইট, ভ্যালেন্টাই ডে আর পহেলা বৈশাখের নামে যাবতীয় বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে নিশ্চুপ ও নিষ্ক্রিয় থাকায়ই তা প্রমাণিত হয়। আসলে তারা মহান আল্লাহ পাক উনার হাবীব হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মনোনীত দ্বীন ইসলাম না করে জোট সরকারের ইসলাম নিয়েই মত্ত আছেন তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ অনৈসলামী আচারের বিরুদ্ধে বললে, আইনের বিরুদ্ধে বললে রেওয়াজের বিরুদ্ধে বললে তাদের মার্কিন প্রভূ রুষ্ট হয়। জোট সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন খর্ব হয়। তাই মন্ত্রীত্ব, এমপি, প্রশাসনে, ঠিকাদারীতে আসন ভাগাভাগিতে সরকারের সাথে তারা যত দরকষাকষি করেন, চাপ প্রয়োগ করেন মার্কিনী প্রভুর ভয়ে জনগণকে অনৈসলামী আচার ও চেতনার বলয় থেকে মুক্ত করতে তারা কিছুই করেন না। অথচ নির্বাচনের মৌসুম এলে এই অনৈসলামী জনগণের কাছ থেকেই তারা ইসলামের নামে ভোট চান। কিন্তু ক্ষমতায় আসলে ইসলামের জন্য কিছুই করেন না। কেবলই ক্ষমতার হালুয়া-রুটি চেটে-পুটে খেয়ে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তির প্রসার ঘটাতে ব্যস্ত থাকেন। কারণ অবশ্য তারাও জানেন যে, জনগণকে ইসলামী চেতনায় আপ্লুত করলে অনৈসলামী অনুষঙ্গের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে শেখালে জনগণ প্রথমে সবচেয়ে বড় অনৈসলামী হওয়ার প্রেক্ষিতে ইসলামের নাম ব্যবহার করে তাদের অনৈসলামী রাজনীতিই আগে সমূলে উপরে ফেলবে। আর এ কারণেই কি থার্টি ফার্স্ট নাইট, কি ভ্যালেন্টাইন ডে, কি বাসন্তী উৎসব, কি পহেলা বৈশাখ অথবা হাজারো বিদ্য়াত আর বেশরার বিরুদ্ধে তাদের কোন ধারাবাহিক চলমান সামাজিক বা ধর্মীয় আন্দোলন নেই। রয়েছে কেবলই মৌসুমী ইসলামী লেবেল আটা রাজনৈতিক আহবান বিপনন। কাজেই, পহেলা বৈশাখের নামে অনৈসলামের আবহে ভেসে সাধারণ মানুষ যতটা না অপরাধী তার চেয়ে অনেক বেশী দোষী ও দায়বদ্ধ তাদের ধর্মীয় অভিভাবক দাবীদার তথাকথিত ইসলামী রাজনীতির তল্পীবাহক ঐ ধর্মব্যবসায়ী উলামায়ে ছুরা। আমজনতার হেদায়েতের পূর্বশর্ত ঐসব ধর্মব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করা, বর্জন করা, তাদের নিস্তানাবুদ করা। |
|
 |