 |
নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে বেপরোয়া হারে
নিজস্ব প্রতিবেদক:
মূল্যস্ফীতির গোলকধাঁধাঁয় ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েই চলেছে। হু হু করে বাড়তে থাকা নিত্যপণ্যের দামের সঙ্গে মানুষের আয়ের কোনো সঙ্গতি নেই। সাধারণ ক্রেতারা পণ্যের অগ্নিমূল্যের দহনে ক্রমাগত দগ্ধ হচ্ছেন। গত এক বছরে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে ৫.৮৮ শতাংশ থেকে ৯০.৯১ শতাংশ পর্যন্ত। আর গত এক মাসের হিসাব করলে বিভিন্ন পণ্যের দাম ১.২৩ শতাংশ থেকে ২২.৭৩ শতাংশ বেড়েছে। তার বিপরীতে গত এক বছরে মানুষের আয় বেড়েছে খুব সামান্য, তাও আবার হাতে গোনা কিছু লোকের। টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) হিসাব অনুযায়ী গত এক বছরে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে ১২.৯৬ শতাংশ। আর খোলা পাম ওয়েলের দাম বেড়েছে ৬.৭৪ শতাংশ। গত এক বছরে মশুর ডালের দাম বেড়েছে ১৩.১২ শতাংশ। গত এক বছরে অ্যাংকর ডালের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশ, ছোলার দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ ও আলুর দাম বেড়েছে ৯০.৯১ শতাংশ। এক বছরে আটার দাম বেড়েছে ১৮.৩৭ শতাংশ, ময়দার দাম বেড়েছে ২৭.১৪ শতাংশ, লবণের দাম বেড়েছে ৬৫.৬৩ শতাংশ ও গুঁড়া দুধের দাম বেড়েছে ১৩.৮৬ থেকে ১৮.৬৯ শতাংশ। মসলা জাতীয় পণ্যের মধ্যে পিঁয়াজের দাম গত এক মাসে বেড়েছে ২২.৭৩ শতাংশ। আর এক বছরে এ বৃদ্ধির পরিমাণ ১৬.২৮ শতাংশ। গত এক মাসে রসুনের দাম ৩৯.১৩ শতাংশ বাড়লেও বছরের হিসেবে তা কিছূটা কমেছে। এছাড়া আমিষের বাজারে ইলিশের দাম বেড়েছে ৬৩.৬৪ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ৩৯.২২ শতাংশ, মুরগীর ডিমের দাম বেড়েছে ৫১.০৬ শতাংশ, দেশি মুরগীর দাম বেড়েছে ৭.১৪ শতাংশ ও গরুর গোশতের দাম বেড়েছে ৫.৮৮ শতাংশ। তবে খাসির গোশতের দাম বাড়েনি। এত পণ্যে দাম বাড়ার ফাঁকে দুই একটি পণ্যের দাম কমলেও তা ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসেনি। কমার তালিকায় রয়েছে দুই একটি আইটেম বাদে প্রায় সব ধরনের চাল, চিনি, আদাসহ আরো কয়েকটি পণ্য। টিসিবির হিসেবে চিনির বর্তমান বাজার দর ৫২-৫৩ টাকা। এ হিসাবে গত এক বছরে চিনির দাম কমেছে ১১.০২ শতাংশ। যদিও বাজারে বেশির ভাগ দোকানী চিনি বিক্রি করছেন ৫৬ থেকে ৫৮ টাকা কেজি। এছাড়া মোটা চালের দাম কমেছে ৭.৮১ শতাংশ ও মাঝারি মানের চালের দাম কমেছে ৪.১১ শতাংশ। অবশ্য পাইজামের দাম বেড়েছে ১.৩৫ শতাংশ এবং উন্নতমানের নাজিরশাইল/মিনিকেটের দাম বেড়েছে ১.০৮ শতাংশ। মিরপুর ১৩ বাইশটেকীর বাসিন্দা গার্মেন্টস শ্রমিক মুহাম্মদ এরফান বলেন, ‘২২ বছর ধরে গার্মেন্টসে কাজ করছি। এতদিন চাকরি করার পরও সব মিলিয়ে বেতন পাই ৯ হাজার ৫০০ টাকা। সামান্য এ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া দিতে হয়। বাকি টাকা দিয়ে দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালানোসহ পরিবারের সব খরচ মেটাতে হয়। বাড়িভাড়াসহ সব কিছুর দাম প্রতিবছর বছর বাড়ছে কিন্তু আমাদের বেতন বাড়ে না।’ তিনি বলেন, ‘খুব হিসাব করে চলেও খরচের কোনো কূল-কিনারা করতে পারছি না। অষ্টম শ্রেণী পাস করার পর বড় ছেলেটার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বড় ভাইয়ের সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। সরকার হয় আমাদের বেতন বাড়ানোর ব্যবস্থা করুক, নয়তো জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে আনুক। এর বেশি কিছু আমরা চাই না।’ এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)- এর সভাপতি কাজী ফারুক বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন হয়েছে, এখানে ধনী আরো ধনী এবং গরিব আরো গরিব হচ্ছে। মুখে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলা হলেও এটা কিভাবে করা হবে সেটা বলা হয় না। কয়দিন আগে বাজেট বক্তৃতায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো দিক নির্দেশনা নেই।’ তিনি বলেন, ‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে এবং কঠোর হতে হবে। মার্কাস সার্ভিলেন্স (কোনো পণ্যের দাম বাড়ার কারণ বের করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া) চালু করতে হবে। সিন্ডিকেট করার বিরুদ্ধে সদ্য পাস হওয়া আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। এক কথায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুধু ধান উৎপাদনে সফল হলে হবে না। অন্যান্য ফসল উৎপাদনে সফল হয়ে দেশকে প্রকৃত অর্থে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হবে এবং খাদ্যে নির্ভরশীলতা বলতে শুধু ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণহওয়ার ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’ ফারুক বলেন, ‘অনেক মানুষই ধার-কর্জ করে জীবনযাপন করছে। তাদের এ অবস্থা থেকে বের করতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।’ উল্লেখ্য, টিসিবি’র নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিকাংশ বিক্রেতা বেশি দামে পণ্য বিক্রি করেন। ফলে টিসিবি’র দেয়া হিসাবের চেয়ে প্রকৃতপক্ষে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির হার বেশি।
|
|
 |