দেশের খবর - ২৩ জুলাই, ২০১২
রোযার দু’দিন দিন আগেও ছিল ৯০-এর ঘরে। মৌসুম চলে যাওয়ার পর ৯০-এর ঘরেই আটকে ছিল অনেক দিন। প্রথম রোযার আগের দিন হঠাৎ লাফ দিয়ে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ফেলল। এখন রোযার শুরুতে সে ১২০/১৫০-এর ঘরে স্থান করে নিয়েছে। এটা বাজারদরের চিত্র। আর পণ্যটি হলো টমেটো। রাতারাতি টমেটোর দাম এভাবেই বেড়েছে। এক দিনের মধ্যে টমেটো উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সামান্যতম তারতম্য হয়নি। অথচ দামের দিক দিয়ে শনিবার রমযানের প্রথম দিন থেকে টমেটো সেঞ্চুরি হাঁকানোর ঘরে ঢুকে পৌঁছে গেল ১২০-১৫০ টাকায়। এই ঘরে ঢুকে পড়া আরেকটি পণ্য হচ্ছে ডাল। ডাল অবশ্য সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে এক বছরের ব্যবধানে। গত রমযানেও ডালের মূল্য এতটা ছিল না। আর ছোলা এখন সেঞ্চুরি ছুঁই ছুঁই, ৯০ টাকা কেজি। গত রমযান মাস আর গত শনিবার শুরু হওয়া এবারের রমযান মাসের বাজারদর বিশ্লেষণ করে মাত্র দুটি পণ্য পাওয়া গেল, যার দাম কমেছে। ব্যতিক্রমী পণ্য দুটি হলো চিনি ও পেঁয়াজ। তবে শিল্প মন্ত্রণালয় চেষ্টা করেছিল চিনির দর আরও বাড়াতে। সেই চেষ্টা খানিকটা সফল হওয়ায় চিনি এখন অর্ধশতক পার করে আপাতত থিতু হয়েছে। রমযান যেন এখন ব্যবসায়ীদের চুটিয়ে ব্যবসা করার মাস। এই বাজারে সব ক্ষেত্রেই কেবল সংযম করতে হচ্ছে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষকে। ফেসবুকে গতকাল দুপুরে একজন লিখেছে, ‘ইফতার কিনতে গিয়েছিলাম, কলার হালি ৩২ টাকা, আপেলের কেজি ১৭০ টাকা আর এক হালি লেবু কিনতে হলো ৩০ টাকায়। এটা নাকি সংযমের মাস!।’ এ তো গেল দুপুরের বাজার। বিকেলের বাজারদর কিন্তু ভিন্ন, ঢাকার অনেক বাজারেই ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে মাত্র চারটি লেবু। গত এক বছরে সরকার তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ায়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যেই আছে, সদ্য বিদায় নেয়া অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয় কমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে বলেই কমে গেছে সঞ্চয়ের হার। অথচ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলছে। আয় বাড়েনি, কিন্তু বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। আর রমযান মাসকে ব্যবসা করার মাস হিসেবে বেছে নেয়ায় সাধারণ মানুষের বাজার খরচ বেড়ে গেছে অনেক অনেক বেশি। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবেই এক বছরে অন্য সব পণ্যের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত। গতকাল রবিবার মহাখালীর বাজারে এসেছিলো পারভেজ হোসেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘রোযা শুরুর পয়লা দিনেই সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। এ দেশে সরকার আছে বলে আমার মনে হয় না।’ দাম স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব সরকারের। নির্বাচনী ইশতেহারে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখাকে সরকারি দলই প্রথম অগ্রাধিকার রেখেছে। অথচ বাজারে তদারকি বলতে তেমন কিছু নেই। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠক ছাড়া দৃশ্যমান কোনো তদারকি দেখা যাচ্ছে না। রমযানের মাস খানেক আগেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার তদারকির জন্য ১৪টি টিম গঠন করে। কিন্তু এসব তদারক টিম মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। গতকাল বাজারদর নিয়ে কথা বলার জন্য বড় কোনো ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ীকে পাওয়া যায়নি। সবাই সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে কোনো না-কোনো বৈঠকে ব্যস্ত। বৈঠকও হচ্ছে, নিত্যপণ্যের দামও বাড়ছে। সরকারিভাবে দ্রব্যমূল্য তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত ট্যারিফ কমিশনের বিদায়ী চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান কয়েক দিন আগে এক সেমিনারে বলেছেন, ভোজ্যতেল ও চিনি ছাড়া রমযানে প্রয়োজনীয় সব পণ্যে ৫০ শতাংশ থেকে শতভাগ পর্যন্ত মুনাফা করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উত্তর বাড্ডার আলীমোড় বাজারে এসেছিলো পোশাকশ্রমিক রহিম। রমযানের বাজার করছেন কিনা জানতে চাইলে সে বলে যে, ‘জিনিসপত্রের যে দাম, কিছুই তো কিনতে পারি না। ছোলা কিনছি এক কেজি, চিনি তিন কেজি, তেল দুই কেজি। গতবার রোযার আগের দিন সব জিনিসই ডাবল কিনছিলাম।’ কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি কাজী ফারুক বলেছেন, ‘আমাদের দেশে ভোক্তারা বড়ই অসহায়। তাদের কথা কেউ চিন্তা করে না। সবাই শুধু মুনাফার কথাই চিন্তা করে।’ সরকারের তদারকি নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
|