 |
বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের হাসি নেই মুন্সীগঞ্জের খোলা আকাশের নিচে হাজার হাজার বস্তা আলু
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
মুন্সীগঞ্জের প্রধান অর্থকারী ফসল আলুর এবার বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার সর্বত্রই জমির পর জমি জুড়ে এখন আলু উত্তোলনের চিত্র দেখা যায়। কৃষক মহাব্যস্ত আলু উত্তোলনে। মুন্সীগঞ্জের মাটি ও মানুষের স্বপ্নের নাম হয়ে উঠেছে আলু। আলু উত্তোলন মৌসুমের শুরুতে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করতে গিয়ে কৃষক পড়েছে মহাবিপদে। তার সঙ্গে পাইকারের অভাব, দাম কম, কোল্ড স্টোরেজে ভাড়া বৃদ্ধি, দালালের দৌরাত্ম্য ভাবনায় ফেলে দিয়েছে আলু চাষীদের। উৎপাদন খরচের তুলনায় আলুর দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদিত আলু নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কৃষক। মুন্সীগঞ্জের আগাগোড়া এখন সোনা সোনা আলুর সারি। গোল সোনা হয়ে উঠেছে এই আলু। কিন' বাম্পার ফলনের পরও কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষনের অভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে হাজার হাজার বস্তা আলু। মুন্সীগঞ্জের প্রতিটি কোল্ড স্টোরেজের সামনে সংরক্ষণের অভাবে এমনি বস্তায় বস্তায় আলু পড়ে থাকার প্রতিচিত্র ফুটে উঠেছে। আলুর কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় কৃষকের হাসি মাখা মুখে এখন লোকসানের ছাপ। এবার মুন্সীগঞ্জে ৩৬ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়। গত মৌসুমে জেলায় ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছিল। এবার তার চেয়ে ১ হাজার মেট্রিক টন আলু বেশি আবাদ হবে বলে কৃষি কর্মকর্তরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। জেলায় সাড়ে ৪ লাখ ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ৭১টি হিমাগার রয়েছে। এর মধ্যে ৫৯টি হিমাগার চালু রয়েছে। কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া বৃদ্ধি: প্রশাসনকে উপেক্ষা করে গেলো বারের থেকে এবার কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া দ্বিগুণ নির্ধারণের মাধ্যমে কৃষককে জিম্মি করার চেষ্টায় লিপ্ত হিমাগার মালিক এসোসিয়েশন। এই অভিযোগ-মুন্সীগঞ্জের জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও কৃষক প্রতিনিধিদের। ভাড়া বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে বাজারকে অসি'তিশীল করার জন্য কোল্ড স্টোরেজ এসোসিয়েশনকে দায়ী করেছেন মুন্সীগঞ্জের প্রশাসন। এতে প্রশাসন হিমাগার মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।। এমনকি গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া নির্ধারণ করায় কোল্ড স্টোরেজ এসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা প্রস্তাব আনে জেলা প্রশাসকের সভা কক্ষে আয়োজিত এক সভায়। আলু উত্তোলন মৌসুম শুরু থেকে এ পর্যন্ত হিমাগারের ভাড়া নির্ধারণের জন্য ১০ দিনের ব্যবধানে তিন দফা বৈঠক হয়েছে ডিসির সভাকক্ষে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ এসোসিয়েশনের নেতারা তিনটি সভায় অনুপসি'ত থাকায় সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। কোল্ড স্টোরেজ এসোসিয়েশনের নেতারা অনুপসি'ত থেকে একতরফাভাবে ৮০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ২৬০ টাকা হারে হিমাগারের ভাড়া নির্ধারণ করেছে। অথচ গত বছর ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে মুন্সীগঞ্জের কৃষকরা এখন চরম ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে সরকারের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে বলে কৃষকরা জানিয়েছে। মোড়ে মোড়ে চাঁদার শিকার কৃষক: কোল্ড স্টোরেজের মোড়ে মোড়ে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। আলু সংরক্ষণ করতে গিয়ে কৃষকদের কয়েক দফা চাঁদাবজি সিন্ডিকেডের মুখে পড়ছে। মঙ্গলবার মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চলের খাসের হাট এলাকার নুরানী কোল্ড স্টোরেজে ভেতর আলু ঢুকাতে পারেনি কৃষক। ১৫-২০ জনের একটি সিন্ডিকেডের দখলে রয়েছে চরের ওই হিমাগারটি। বস্তা প্রতি ২০ টাকা বেঁধে দেয়া হয়েছে কৃষকদের চাঁদার পরিমাণ। আলু হিমাগারের ভেতরে ঢুকাতে মনা পারায় একদিনেই খাসের হাটের কোল্ড স্টোরেজের সামনে খোলা আকাশের নিচে কয়েক হাজার বস্তা আলু পড়ে থাকে। জেলার গজারিয়া উপজেলার মেঘনা মাল্টি পারপাস ও বোগদাদীয়া কোল্ড স্টোরেজে ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬০ হাজার বস্তা। এই ২টি হিমাগারের ভেতর অগ্রিম কোটা বরাদ্দ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা পড়েছে বিপদে। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার ফাইভ স্টার কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করতে গিয়ে কৃষকরা ৫০ টাকা করে দালাল ও ফরিয়াদের দিচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের প্রতিটি কোল্ড স্টোরেজের চিত্র একই। চরাঞ্চলের কৃষক জামান, আবুল, মান্নান এই কথা বলেন। কৃষকের মুখে হাসি নেই: বাম্পার ফলনের পরও আলু উত্তোলনে ব্যস্ত কৃষকের মুখে হাসি নেই। মুন্সীগঞ্জে দিগন্তের প্রান্ত ছুঁয়ে আলু উত্তোলন উৎসব- তবু এবার আলুর দাম কম হওয়ায় কৃষকের মুখের হাসি ম্লান হয়ে পড়েছে। পাইকার নেই, বড় ব্যবসায়ীরা হাত গুটিয়ে আছেন, কোল্ড স্টোরেজের ভাড়া বৃদ্ধি- এসবই দুশ্চিন্তায় পড়েছে কৃষক। উপরন' উৎপাদন খরচ বেশি পড়েছে। কিন' বর্তমান বাজারে আলুর দাম কমছে। মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চলে ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সবুজের মাঠে আলু উত্তোলনের এমন মহোৎসব সত্ত্বেও কৃষকের সঙ্গে কথা বলে ওইসব তথ্য পাওয়া গেছে। টঙ্গীবাড়ী উপজেলার মান্দ্রা গ্রামের আলু চাষী রমিজ মিয়া জানান, এবার প্রতি মণ আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে সাড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কিন' বর্তমানে বাজার মুল্যে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মণ প্রতি সাড়ে ৩০০ থেকে ৪২০ টাকা। জমিতে আলু উঠানো শুরু হওয়া মাত্র পাইকারদের ঢল নামে প্রতি বছর। তারা আলু কিনে নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অথচ এবার সোনালী রংয়ের মাঠে পাইকারদের দেখা নেই। পাইকাররা আলু না কিনলে ওই আলু সংরক্ষণে এবার কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া দ্বিগুণ পড়বে। তাই বাম্পার ফলনের পরও আলু চাষীদের নাভিশ্বাস উঠেছে। |
|
 |