কক্সবাজারের মহেশখালী মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের অর্থনীতিতে ইনশাআল্লাহ সোনালী সম্ভাবনা উন্মোচন করবে
দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড- হবে এ মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর; দেশবাসীকে মাতারবাড়ীর সুফল প্রদানে সরকারকে আরো সমন্বিত এবং সক্রিয় প্রচেষ্টা চালাতে হবে
, ০৯ মুহররমুল হারাম শরীফ, ১৪৪৪ হিজরী সন, ২৯ ছানী, ১৩৯১ শামসী সন , ২৮ জুলাই, ২০২৩ খ্রি:, ১৩ শ্রাবণ, ১৪৩০ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) মন্তব্য কলাম
চট্টগ্রাম বন্দরের সূচনা ১৮৮৭ সালে। এ বন্দরের জোয়ারের সময় সর্বোচ্চ গভীরতা হয় সাড়ে ৯ মিটারের মতো। ফলে সেখানে বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। এ অবস্থায় দেশে যে বাড়তি গভীরতার বন্দর দরকার, তা প্রথম উপলব্ধিতে আসে ১৯৭৮ সালে।
এরপর ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। তখন এটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে। পরে আলোচনায় আসে পটুয়াখালীর পায়রা। সবশেষে সিদ্ধান্ত হয় কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর মাতারবাড়ীতেই হবে গভীর সমুদ্রবন্দর।
কর্ণফুলী নদী থেকে সাগরপথে মাতারবাড়ীর দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। সেখানে গিয়ে দেখা মেলে ১৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নৌপথের। সাগর থেকে উপকূল পর্যন্ত পাথর দিয়ে তৈরি বাঁধ থাকায় নৌপথে তেমন ঢেউ নেই। এতে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানো-নামানোয় পাওয়া যাবে বাড়তি সুবিধা।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এলাকায় পানি পুরো নীল। দেশের আর কোনো বন্দরে এমন নীল পানি নেই। নীল পানি থাকা মানে নৌপথের বড় অংশে পলি জমার আশঙ্কা কম।
দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর মুল ভূখন্ড থেকে মাতারবাড়ি ইউনিয়ন একটি আলাদা দ্বীপ বলা যায়। কয়েক বছর আগেও কেউ জানত না এখানকার অবস্থা। তবে এখানেই নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর। এর মধ্যেই শেষ হয়েছে ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল। যার প্রশস্ততা ২৫০ মিটার ও গভীরতা ১৮ দশমিক ৫ মিটার। এছাড়া বাণিজ্যিক বন্দর বাস্তবায়নের জন্য চ্যানেলকে প্রশস্ত করা হয়েছে আরও ১০০ মিটার।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রথম জেটিটি নির্মাণ শেষে ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক জাহাজ 'এমভি ভেনাস ট্রায়াম্প' প্রথমবারের মতো ভিড়েছিল। পরবর্তীতে নির্মিত দ্বিতীয় জেটিতেও ২০২১ সালের ১৫ জুলাই জাহাজ ভিড়ে। আর ২০২২ সালের ২৪ আগস্ট সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পাশেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে এমভি হোসেই ফরচুন' নামের জাহাজটি ভিড়ে। এটি ছিল নির্মিত জেটিতে শততম জাহাজ। তবে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের আগে থেকেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে জাহাজ ভেড়ানো শুরু হয়েছিল। সমুদ্রগামী জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ করে আসছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে স্থানীয়রা মনে করছেন, দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর।
গভীর সমুদ্রবন্দরে যেহেতু বড় বড় জাহাজ ঢুকতে পারবে, সেহেতু আমাদের দেশেই বড় বড় জাহাজের মালিক গড়ে উঠবে। বড় বড় জাহাজের ব্যবসা গড়ে উঠবে। শুধু তা-ই নয়, এসব জাহাজ তৈরির কারখানাও গড়ে উঠবে। সব মিলিয়েই এই মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর আমাদের অর্থনীতির পথনকশা বদলে দেবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আশা, ২০২৬ সালের মধ্যেই পুরোদমে চালু হবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। গভীর সমুদ্রবন্দরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু না হলেও এরই মধ্যে কয়লা নিয়ে জাহাজ নোঙর শুরু হয়েছে মাতারবাড়ীতে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের যন্ত্রপাতি নিয়ে অন্যান্য জাহাজও নোঙর করবে খুব শিগগিরই। কক্সবাজারের মহেশখালীর বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় ১৪০০ একর লবণভূমিতে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর। জেলা প্রশাসন প্রথম দফায় ৪০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে বন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় দফায় আরও ১ হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণের জন্য জরিপের কাজ চলছে, যা বন্দর কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হবে। এরই মধ্যে গভীর সমুদ্রবন্দরে যাতে নির্বিঘেœ ১৬ মিটার ড্রাফটের বড় জাহাজ ভিড়তে পারে সে জন্য তৈরি করা হয়েছে ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাপ্রোচ চ্যানেল। গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি চাহিদা মেটাবে। পুরো মহেশখালীকে পরিণত করবে বহুমুখী কর্মযজ্ঞের কেন্দ্র হিসেবে। এ স্বপ্ন পূরণে বিশ্বমন্দার মধ্যেও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে গভীর বন্দরের কার্যক্রম।
বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যে চলছে এখন সংকট। সহজে মিলছে না রপ্তানি পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজে বুকিং। কনটেইনার ডিপোগুলোতে রপ্তানি পণ্যে জট। ঠিক এ সময়ে যদি দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর থাকত, তাহলে সমস্যা সমাধানে বিকল্প হাতে থাকত। ইউরোপ-আমেরিকায় সরাসরি পণ্য পরিবহন সেবা থাকলে যেমন অগ্রাধিকার পেত এ দেশের রপ্তানিকারকেরা, তেমনি বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে বড় আকারের এক-দুই জাহাজেই জমে থাকা সব রপ্তানি পণ্যের কনটেইনার ইউরোপ-আমেরিকায় নেওয়া যেত।
গভীর সমুদ্রবন্দরে বড় জাহাজে করে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা গেলে তাতে পণ্য পরিবহন খরচ কমবে। সময়ও কম লাগবে। সব মিলিয়ে ব্যবসার খরচ কমে যাবে।
মাতারবাড়ী নিয়ে জাইকার সমীক্ষায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে তুলনা করলে মাতারবাড়ী টার্মিনালে সমুদ্রপথে প্রতি ২০ ফুট লম্বা কনটেইনারে খরচ সাশ্রয় হবে ১৩১ ডলার। আর ৪০ ফুট লম্বা কনটেইনারে সাশ্রয় প্রায় ১৯৭ ডলার।
মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হলে ৮ হাজার ২০০ টিইইউএস ক্ষমতাসম্পন্ন কন্টেনার বহনকারী জাহাজ নোঙ্গর করতে পারবে। ফলে পণ্য নিয়ে সিঙ্গাপুর, কলম্বো আর মালয়েশিয়ার বন্দরে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের আর অপেক্ষায় থাকতে হবে না। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় একটি পণ্যের চালান পাঠাতে সময় লাগে ৪৫ দিন। মাতারবাড়ি বন্দর চালু হলে মাত্র ২৩ দিনেই সরাসরি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হলে অন্যান্য বন্দর থেকে এর দূরত্ব বেশি হবে না। চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রপথে মাতারবাড়ির দূরত্ব ৩৪ নটিক্যাল মাইল, পায়রা বন্দর থেকে মাতারবাড়ির দূরত্ব ১৯০ নটিক্যাল মাইল ও মোংলাবন্দর থেকে গভীর সমুদ্রবন্দরের দূরত্ব ২৪০ নটিক্যাল মাইল। তাই মাতারবাড়িতে মাদার ভেসেল (বৃহদাকার কন্টেনার জাহাজ) থেকে পণ্য খালাস করে অল্প সময়ের মধ্যে সড়ক ও সমুদ্রপথে অন্যান্য বন্দরে পরিবহন করা যাবে। পুরোদমে মাতারবাড়ি বন্দর চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। পরিসংখ্যান বলছে গভীর সমুদ্রবন্দর জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে ২-৩ শতাংশ অবদান রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে তৈরি হচ্ছে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ও রেলপথ। মাতারবাড়ি বন্দর থেকে রেললাইন এসে যুক্ত হবে কক্সবাজার দোহাজারি রেললাইনের সঙ্গে। সংযোগ ঘটবে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কেও। বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এই সুুবিধাটা যদি আমরা ব্যবহার করতে পারি সঠিকভাবে, তাহলে বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে পুরো অর্থনৈতিক কর্মকা-ে এটা ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
আমেরিকা থেকে উচ্চমূল্যে বিষাক্ত গম আমদানি বন্ধ করতে হবে
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আইনি লেবাসে সন্ত্রাসী ইহুদিদের পৈশাচিক রাষ্ট্রীয় হত্যাকা-: ইসরায়েলের বর্বরতা, আন্তর্জাতিক নীরবতা এবং আমাদের করণীয়
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছির আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না।
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও সার্বভৌমত্বের দুশমনদের অপতৎপরতা-উগ্র হিন্দুত্ববাদী ‘রবীন্দ্র ঘোষ’ ও ‘চিন্ময়’ চক্রের রাষ্ট্রদ্রোহী আঁতাত এবং প্রশাসনের জগৎশেঠদের মুখোশ উম্মোচন
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছির আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না।
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বাংলাদেশের পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন: একবিংশ শতাব্দীর কৌশলগত অপরিহার্যতা
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ইরান-সন্ত্রাসী আমেরিকা সন্ত্রাসী ইসরাইল যুদ্ধ: রহস্যময় ড্রোন, ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন ও যুদ্ধ অর্থনীতির বাস্তবতা
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
জুলাই সনদের ওপর গণভোট আদৌ সংবিধান সম্মততো নয়ই; শুধু এতটুকুই নয় বরং তা আদৌ বাস্তবসম্মতও নয়। অভিজ্ঞমহল বলেন, নির্বাচন কমিশন জাতির সঙ্গে তামাশা করছে। এত জটিল হিসাব-নিকাশে কি গণভোট হয়?
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা: ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে বাঁচার একমাত্র পথ
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
জ্বালানি সংকট ব্যবস্থাপনায় স্বনির্ভরতায় জোর দেয়ার বিকল্প নেই
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশে গ্যাস সংকট : টেকসই সমাধান দেশের গ্যাস কূপগুলো খনন করা
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সার্বভৌমত্বের হিফাযতে বাংলাদেশের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা’ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এখন সময়ের দাবি ও সরকারের জন্য ফরয
৩১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












